🏆 আজকের ফ্রি বাংলা কুইজ খেলুন এবং Gift Voucher পুরস্কারের জেতার সুযোগ নিন।
Play Now
আগরতলা হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী শহর। এটি শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্রই নয়, বরং ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর একটি শহর। আগর গাছের আধিক্য থেকেই শহরের নামকরণ হয়েছে “আগরতলা”। একসময় এখানে প্রচুর আগর গাছ ছিল, যার কাঠ থেকে তৈরি হতো ধূপ বা আগরবাতি। যদিও বর্তমানে নগরায়নের কারণে আগর গাছের সংখ্যা কমেছে, তবে আজও শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু আগর গাছ দেখা যায়।
আগরতলা কোথায়? Where is Agartala?
আগরতলা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরার পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। ভৌগোলিকভাবে এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পূর্বে।
আগরতলা শব্দের অর্থ কি? What is the meaning of the word Agartala?
“আগরতলা” শব্দের অর্থ হলো “আগর গাছের তলায়”। কারণ একসময় এখানে অসংখ্য আগর গাছ ছিল এবং সেখান থেকেই এই নামকরণ হয়েছে।
আগরতলা মানচিত্র, Agartala Map:
মানচিত্রে আগরতলা ত্রিপুরার পশ্চিমে অবস্থান করছে। শহরের একদিকে বাংলাদেশের সীমান্ত এবং অন্যদিকে পাহাড়ি টিলা অঞ্চল। গোমতী নদী এবং অন্যান্য উপনদীর প্রভাবে এখানে উর্বর সমতল ভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
আগরতলার ইতিহাস, History of Agartala :
আগরতলা শহরের ইতিহাস বহু প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। ত্রিপুরার রাজধানী হিসেবে আগরতলার পরিচিতি হলেও এর শেকড় ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসে।
প্রাচীন যুগ, Ancient era:
লোককাহিনী ও প্রাচীন সূত্রে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকেই ত্রিপুরায় কিছু রাজ্যের উত্থান ঘটে। সেই সময়ে পাত্রদান ছিলেন অন্যতম শাসক। পরবর্তীতে দ্রুহ্য বংশ এবং বিভিন্ন পৌরাণিক রাজাদের নামও আগরতলার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে।
মানিক্য রাজবংশ
ত্রিপুরার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মানিক্য রাজবংশ। এই রাজবংশ প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ত্রিপুরা শাসন করেছে। রাজধানী হিসেবে প্রথমে উনকোটির নিকটবর্তী এলাকা নির্বাচিত হলেও, পরে তা স্থানান্তরিত হয় আগরতলায়।
মহারাজা গোবিন্দমাণিক্য, রাধাকিশোর মানিক্য, বীর বিক্রম কিশোর দেববর্মণ প্রমুখ শাসক আগরতলাকে গড়ে তুলেছিলেন। তাদের আমলেই নির্মিত হয়েছিল বিখ্যাত উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ এবং ভুবনেশ্বরী মন্দির।
মুঘল ও ব্রিটিশ শাসন
১৬ শতকের পর থেকে ত্রিপুরা মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন হয়। যদিও মুঘলরা সরাসরি ত্রিপুরা শাসন করেনি, তবে কর প্রদানের মাধ্যমে রাজ্যটি তাদের অধীনস্থ হয়।
১৮০৮ সালে ব্রিটিশরা ত্রিপুরাকে তাদের শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে। এর পর থেকেই আগরতলা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
স্বাধীনতা আন্দোলন
আগরতলা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী এই অঞ্চলে কাজ করেছেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং আগরতলা হয় রাজধানী।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে যে তারা ভারতের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করছে। এই মামলাটি ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এই মামলার মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।
আধুনিক আগরতলা, Modern Agartala :
স্বাধীনতার পর আগরতলা ত্রিপুরার রাজধানী হিসেবে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। এখানে গড়ে ওঠে আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেলপথ, বিমানবন্দর ও শিল্পাঞ্চল। বর্তমানে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর।
আগরতলা রাজবাড়ী ইতিহাস, History of Agartala Palace :
আগরতলার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য নিদর্শন হলো উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ বা আগরতলা রাজবাড়ি। মাণিক্য রাজবংশের মহারাজা রাধাকিশোর মানিক্য ১৯০১ সালে এই রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি ত্রিপুরা স্টেট মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজবাড়ির অভ্যন্তরে রয়েছে ত্রিপুরার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পকলা সম্পর্কিত অসংখ্য নিদর্শন। এর স্থাপত্যশৈলীতে মুঘল ও ইউরোপীয় ধাঁচের মিশ্রণ রয়েছে। প্রাসাদের ভেতরে সুন্দর বাগান, পুকুর ও সুশোভিত গ্যালারি রয়েছে। এটি এখনো আগরতলার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
আগরতলা পৌরসভা, Agartala Municipality :
আগরতলা পৌরসভা বা আগরতলা পুর নিগম হলো শহরের স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থা। ১৮৭১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রাচীন পুর নিগম হিসেবে পরিচিত।
আগরতলা দর্শনীয় স্থান /আগরতলা দেখার মত কি আছে? Agartala tourist attractions :
আগরতলা ছোট শহর হলেও এর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ (আগরতলা রাজবাড়ি)
- লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ি
- জগন্নাথ মন্দির
- রামঠাকুর আশ্রম
- দুর্গাবাড়ি
- হেরিটেজ পার্ক
- এলবার্ট এক্কা পার্ক
- নেহেরু পার্ক
- অক্সিজেন পার্ক
- শহরের কাছেই রয়েছে শান্ত সুন্দর পরিবেশে সাজানো চা বাগান, যা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।
এছাড়া শহরের উৎসব, যেমন দুর্গা পূজা ও আগরতলা বইমেলা, পর্যটকদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
আগরতলা মামলা, Agartala case :
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এটি পাকিস্তানি আমলে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, যা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতিকে ত্বরান্বিত করে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি কতজন :
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মোট ৩৫ জন আসামি ছিলেন। তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
আগরতলা ইমিগ্রেশন সময়সূচি :
আগরতলা ও বাংলাদেশের আখাউড়া সীমান্তে স্থলবন্দর এবং ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট রয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ থাকে। এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার।
আগরতলা কোন নদীর তীরে অবস্থিত? Agartala is located on the banks of which river??
আগরতলা শহর হাওড়া নদীর তীরে অবস্থিত। এই নদী শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্থানীয়দের জন্য জলসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।
আগরতলার ভাষা কি? আগরতলায় কোন ভাষায় কথা বলে? What language is spoken in Agartala?
আগরতলার সরকারি ভাষা হলো বাংলা, ককবরক ও ইংরেজি। তবে কথ্য ভাষা হিসেবে বাংলাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ত্রিপুরার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ককবরক, চাকমা ও অন্যান্য উপজাতীয় ভাষাও প্রচলিত।
আগরতলার জনসংখ্যা কত? What is the population of Agartala?
২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আগরতলার জনসংখ্যা প্রায় ৫,২২,৬১৩ জন। শহরে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে বসবাস করে, যার মধ্যে বাঙালি, ত্রিপুরী, চাকমা, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য।
আগরতলা বিমানবন্দরের নাম কি? What is the name of Agartala airport?
আগরতলার বিমানবন্দরটির নাম হলো মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর। এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর এবং কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোরসহ দেশের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।
আগরতলা সীমান্তের নাম কি? What is the name of the Agartala border?
আগরতলার সীমান্তের নাম হলো আগরতলা-আখাউড়া সীমান্ত। এটি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম ব্যস্ত সীমান্ত চেকপোস্ট।
আগরতলা কিসের জন্য বিখ্যাত? What is Agartala famous for?
আগরতলা বিখ্যাত—
- উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ ও রাজবংশের ইতিহাসের জন্য
- হস্তশিল্প, বিশেষ করে বাঁশ ও বেতের কাজের জন্য
- আগর কাঠ থেকে তৈরি ধূপ বা আগরবাতির জন্য
- সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও উৎসবের জন্য
আগরতলা আবাসিক হোটেল, Agartala Residential Hotel :
আগরতলায় ভ্রমণকারীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা তথা রাজবাড়ি সংলগ্ন অংশে, শকুন্তলা রোড এবং ত্রিপুরা ট্যুরিজম অফিসের কাছাকাছি বেশ কয়েকটি সুপরিচিত হোটেল রয়েছে। এখানে বিলাসবহুল হোটেল থেকে শুরু করে বাজেট হোটেল পর্যন্ত সব ধরনের থাকার ব্যবস্থা আছে। উল্লেখযোগ্য হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল সোনারগাঁও, হোটেল গ্যালাক্সি, হোটেল হেরিটেজ ইত্যাদি।
উপসংহার, Conclusion :
আগরতলা হলো একদিকে ঐতিহাসিক, অন্যদিকে আধুনিকায়নের পথে অগ্রসরমান একটি শহর। এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একইসাথে আগরতলার রাজবাড়ি, মন্দির, বইমেলা, উৎসব, আগর কাঠ ও হস্তশিল্প এই শহরকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে আগরতলা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হবে।

