🏆 আজকের ফ্রি বাংলা কুইজ খেলুন এবং Gift Voucher পুরস্কারের জেতার সুযোগ নিন।
Play Now
হাইপোথাইরয়েডিজম একটি রোগ, যা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে পর্যাপ্ত হরমোন নিঃসরণ না হলে সৃষ্টি হয়। থাইরয়েড হরমোন দেহের মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে এর অভাব হলে শরীরে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩% মানুষ আক্রান্ত, বিশেষত মহিলাদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি।
হাইপোথাইরয়েডিজম কি? What is hypothyroidism?
হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism) হলো থাইরয়েড গ্রন্থির একটি সমস্যা যেখানে শরীরে পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন হয় না। থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের দিকে অবস্থিত একটি প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থি, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism), শক্তি উৎপাদন, হজম, শরীরের তাপমাত্রা এবং হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এ গ্রন্থি হরমোন উৎপাদনে ব্যর্থ হয়, তখন শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়।
শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড হরমোনের অভাব দেখা দিলে একে ক্রেটিনিজম বলা হয়। এতে বুদ্ধি ও দেহের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি অলসতা, ওজন বৃদ্ধি এবং নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজম হলে কি হয়? What happens with hypothyroidism?
হাইপোথাইরয়েডিজম হলে শরীরে একাধিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন:
- প্রচণ্ড ক্লান্তি ও অলসতা
- ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
- ওজন বৃদ্ধি, এমনকি স্বাভাবিক খাওয়ার পরও
- ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যাওয়া
- চুল ভেঙে যাওয়া ও চুল পড়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগে ঘাটতি
- বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি
- নারীদের ক্ষেত্রে রজঃচক্রের অনিয়ম
গুরুতর অবস্থায় হাত-পা ফুলে যাওয়া, গলার চারপাশে গলগণ্ড, হৃদযন্ত্রের গতি ধীর হওয়া এবং মিক্সিডিমা কোমা নামক প্রাণঘাতী জটিলতাও হতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজম এর লক্ষণ, Symptoms of hypothyroidism :
হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং অনেক সময় উপসর্গগুলো অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় সহজে ধরা পড়ে না। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- অতিরিক্ত ঘুমানো বা সব সময় ঘুম ঘুম লাগা
- শরীর দুর্বল হওয়া
- ব্রাডিকার্ডিয়া অর্থাৎ হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া
- নখ ভঙ্গুর ও চুল ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া
- মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া
- ঠোঁট ও জিহ্বা মোটা হওয়া
- চিন্তাশক্তি ও কথাবলার গতি ধীর হয়ে যাওয়া
শিশুদের ক্ষেত্রে হাত-পা ঠান্ডা, অতিনিদ্রা ও খাওয়ার অভ্যাস খারাপ হয়ে যাওয়া
মহিলাদের মধ্যে হাইপোথাইরয়েডের লক্ষণ কী কী? What are the symptoms of hypothyroidism in women?
মহিলাদের হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে ক্লান্তি ও দুর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ঠান্ডা সংবেদনশীলতা, ওজন বৃদ্ধি, শুষ্ক ও খসখসে ত্বক, চুল পড়া, অনিয়মিত মাসিক, জয়েন্টে ব্যথা, এবং মেজাজের পরিবর্তন। হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে মহিলাদের ঋতুচক্রে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যার ফলে মাসিক ভারী বা অনিয়মিত হতে পারে, এমনকি ঋতুস্রাব অনুপস্থিতও থাকতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রধান কারণ, Main causes of hypothyroidism :
হাইপোথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো আয়োডিনের অভাব। সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিশেষ করে শিশু এ কারণে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে আয়োডিন ঘাটতি ছাড়াও আরও কিছু কারণ আছে, যেমন:
- হাশিমোতো’স থাইরয়েডাইটিস (Hashimoto’s thyroiditis), একটি অটোইমিউন রোগ
- থাইরয়েড অপারেশন বা আংশিক/সম্পূর্ণ অপসারণ
- তেজস্ক্রিয় আয়োডিন চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- পিটুইটারি গ্রন্থির রোগের কারণে পর্যাপ্ত TSH না হওয়া
- হাইপোথ্যালামাস থেকে TRH নিঃসরণ না হওয়া
- জন্মগত থাইরয়েড হরমোনের অভাব
- গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর পোস্টপার্টাম থাইরয়েডিটিস
হাইপোথাইরয়েডিজম এর কারনে কি রোগ হয়? What diseases are caused by hypothyroidism?
হাইপোথাইরয়েডিজম সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে একাধিক শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন:
- হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ
- গলগণ্ড
- বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভধারণে জটিলতা
- স্নায়বিক রোগ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস
- মানসিক রোগ (বিষণ্ণতা, উদ্বেগ)
- অ্যানিমিয়া
- শিশুদের বামনত্ব ও মানসিক জড়তা
হাইপারথাইরয়েডিজম এর কারনে কি রোগ হয়? What diseases are caused by hyperthyroidism?
অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজম হলো থাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণের সমস্যা। এর ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে যেসব সমস্যা হতে পারে:
- হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া ও হার্ট অ্যারিথমিয়া
- ওজন হ্রাস
- চোখের আকার পরিবর্তন, চোখ ফুলে যাওয়া, চোখে চাপ বা ব্যথা, হালকা সংবেদনশীলতা এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাস হতে পারে।
- উদ্বেগ, রাগ এবং হাত কাঁপুনি
- হাড় ক্ষয় (Osteoporosis)
- মহিলাদের মাসিকের অনিয়ম
যদি হাইপারথাইরয়েডিজমের কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এই জটিলতাগুলো গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজম tsh মাত্রা, Hypothyroidism tsh levels :
হাইপোথাইরয়েডিজম নির্ণয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো TSH (Thyroid Stimulating Hormone) পরীক্ষা।
- প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য স্বাভাবিক TSH মাত্রা: 0.4 – 4.0 mIU/L
- উচ্চ TSH মাত্রা : উচ্চ TSH মানে পিটুইটারি গ্রন্থি থাইরয়েডকে কাজ করার জন্য বেশি উদ্দীপিত করছে, কারণ থাইরয়েডের নিজস্ব হরমোন (T3 এবং T4) কম তৈরি হচ্ছে।
- কম TSH মাত্রা : সাধারণত হাইপারথাইরয়েডিজম নির্দেশ করে
যদি আপনার TSH মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তবে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডাক্তার আপনার উপসর্গ এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সঠিক রোগ নির্ণয় করবেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবেন।
Tsh হরমোন বেড়ে গেলে কি হয়? What happens when TSH hormone increases?
যখন TSH হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন তা মূলত নির্দেশ করে যে শরীরে থাইরয়েড হরমোন (T3 ও T4) যথেষ্ট পরিমাণে নেই। এর ফলে:
- ওজন বৃদ্ধি
- ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
- ত্বক ও চুলের অবস্থা খারাপ হওয়া
হাইপোথাইরয়েডিজম রোগীর ডায়েট চার্ট, Diet chart for hypothyroidism patient :
হাইপোথাইরয়েডিজম রোগীর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নলিখিত খাবারগুলো উপকারী:
- আয়োডিনযুক্ত খাবার: সামুদ্রিক মাছ, দুধ, ডিম, আয়োডিনযুক্ত লবণ
- সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: টুনা মাছ, ডিম, বাদাম, লেবু
- জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার: ঝিনুক, মুরগির মাংস, মাশরুম, মসুর ডাল
- ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩: ফ্যাটি ফিশ, ফ্ল্যাক্সসিড, চিয়া সিড
- আয়রন সমৃদ্ধ খাবার: পালং শাক, লাল মাংস, ডাল
হাইপোথাইরয়েডিজম রোগীর নিষিদ্ধ খাবার, Forbidden foods for hypothyroidism patients :
হাইপোথাইরয়েডিজম রোগীদের চিনি, ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অ্যালকোহল এবং গ্লুটেনযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো থাইরয়েডের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ওজনের সমস্যা বাড়াতে পারে। ক্রুসিফেরাস (ব্রোকলি, ফুলকপি ইত্যাদি) সবজি, সয়াবিন এবং বেশি আঁশযুক্ত খাবারও থাইরয়েড হরমোন শোষণে বাধা দিতে পারে। এছাড়াও কিছু খাবার সীমিত করতে হয় কারণ এগুলো থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে:
- অতিরিক্ত সয়া জাতীয় পণ্য
- কাঁচা ক্রুসিফেরাস সবজি (যেমন বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি)
- অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও জাঙ্ক ফুড
হাইপোথাইরয়েডিজম কি ভাল হয়?Does hypothyroidism get better?
হাইপোথাইরয়েডিজমের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত চিকিৎসা ও সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে রোগীর জীবন স্বাভাবিক থাকে। অনেক রোগী দীর্ঘদিন ওষুধ খেয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করেন।
থাইরয়েড পরীক্ষার নাম কী? What is the name of the thyroid test?
থাইরয়েড পরীক্ষার সাধারণ নাম হলো থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TFT)। এই পরীক্ষাটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। থাইরয়েডের হরমোন মাত্রা নির্ণয় করার জন্য এর মধ্যে সাধারণত TSH, T3 এবং T4 পরীক্ষা করা হয়।
- TSH পরীক্ষা (Thyroid-Stimulating Hormone Test): এটি থাইরয়েড ফাংশন পরীক্ষার অংশ। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এই হরমোনের মাত্রা দেখে থাইরয়েড গ্রন্থি কতটা কাজ করছে, তা বোঝা যায়।
- T3 পরীক্ষা (Triiodothyronine Test): এটি থাইরয়েড হরমোন T3-এর মাত্রা পরীক্ষা করে, যা শরীরের বিপাক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।
- T4 পরীক্ষা (Thyroxine Test): এটি থাইরয়েড হরমোন T4 (থাইরক্সিন)-এর মাত্রা পরিমাপ করে, যা শরীরের বৃদ্ধি ও উন্নয়নে সহায়ক।
হাইপোথাইরয়েডিজম এর চিকিৎসা, Treatment of hypothyroidism :
হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা মূলত হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে সাধারণত লেভোথাইরক্সিন (Levothyroxine) নামক সিন্থেটিক হরমোন সেবন করতে হয়।
চিকিৎসার ধাপ:
- রক্ত পরীক্ষা করে সঠিক ডোজ নির্ধারণ
- প্রতিদিন একই সময়ে খালি পেটে ওষুধ খাওয়া
- নিয়মিত TSH মাত্রা পরীক্ষা করে ডোজ সামঞ্জস্য করা
- প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ চালিয়ে যাওয়া
হাইপোথাইরয়েডিজম থেকে মুক্তির উপায়, Ways to get rid of hypothyroidism :
যদিও স্থায়ী মুক্তি নেই, তবে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের কিছু উপায় রয়েছে:
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন
- সময়মতো TSH ও অন্যান্য পরীক্ষা করা
- স্বাস্থ্যকর ডায়েট মেনে চলা
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো
- দৈনিক হালকা ব্যায়াম করা
- আয়োডিন, সেলেনিয়াম ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
থাইরয়েডের ওষুধ কি সারা জীবন খেতে হয়? Do I have to take thyroid medication for the rest of my life?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েডের ওষুধ সারাজীবন খেতে হয়, বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমের (থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি) চিকিৎসায়। কিছু ক্ষেত্রে, থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসায় ওষুধ সাময়িকভাবে বা দীর্ঘমেয়াদীও লাগতে পারে। তবে, থাইরয়েড রোগের ধরনের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে এবং নির্দিষ্টভাবে এই বিষয়ে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
উপসংহার, Conclusion :
হাইপোথাইরয়েডিজম একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হলেও এটি সঠিক চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আয়োডিন ঘাটতি প্রতিরোধ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস হলো এর মোকাবিলার মূল উপায়। তাই রোগটি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হাইপোথাইরয়েডিজম রোগীর সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।

