🏆 আজকের ফ্রি বাংলা কুইজ খেলুন এবং Gift Voucher পুরস্কারের জেতার সুযোগ নিন।
Play Now
খাজা সলিমুল্লাহ ছিলেন ঢাকার নবাব, একজন মুসলিম নেতা এবং নিখিল ভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি ১৯০৩-০৪ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মুসলিম রাজনীতিতে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা খাজা সলিমুল্লাহ এবং তাঁর সময়কালের বিভিন্ন বিষয়গুলোর নিয়ে আলোচনা করবো।
নবাব খাজা সলিমুল্লাহ কে ছিলেন? Who was Nawab Khwaja Salimullah?
নবাব খাজা সলিমুল্লাহ (১৮৭১–১৯১৫) ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের চতুর্থ নবাব এবং একজন প্রভাবশালী মুসলিম নেতা। তিনি নিখিল ভারতীয় মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের স্থপতি হিসেবে পরিচিত। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নে তাঁর অবদান অপরিসীম। বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন এবং মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তিনি ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য নতুন রাজনৈতিক দিশা তৈরি করেছিলেন।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহের জন্ম, Birth of Nawab Sir Salimullah:
নবাব সলিমুল্লাহ ১৮৭১ সালের ৭ই জুন ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নবাব আহসানউল্লাহ ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী। সলিমুল্লাহ শৈশবেই উর্দু, ফারসি, আরবি ও ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৯৩ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগ দেন, কিন্তু শিগগিরই চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন।
১৯০১ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি ঢাকার নবাব পরিবারের প্রধান হন এবং “নবাব” উপাধি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের মুসলমানদের প্রতিনিধি ও অভিভাবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ঢাকার নবাব পরিবারের বর্তমান বংশধর, Current descendants of the Nawab family of Dhaka:
নবাব সলিমুল্লাহর বংশধরদের মধ্যে অনেকেই ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হয়েছিলেন। তাঁর ছেলে খাজা নাসরুল্লাহ কলকাতার গভর্নর ছিলেন। নাতি স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হন। আরেক নাতি খাজা হাসান আসকারি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন।
ঢাকার পঞ্চম নবাবের তৃতীয় পুত্র খাজা তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৭১ সালে ঢাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমানে নবাব পরিবারের উত্তরসূরিরা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন, যদিও তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব অতীতের মতো নেই।
কোন নবাবকে স্যার উপাধি দেওয়া হয়েছিল? Which Nawab was given the title of Sir?
ব্রিটিশ সরকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহকে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক খেতাব প্রদান করে। তিনি ১৯০২ সালে CIS, ১৯০৩ সালে নবাব বাহাদুর, ১৯০৯ সালে KCSI এবং ১৯১১ সালে GCSI উপাধিতে ভূষিত হন। এর মধ্যে ‘স্যার’ উপাধি তাঁকে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয় এবং তিনি ইতিহাসে “নবাব বাহাদুর স্যার খাজা সলিমুল্লাহ” নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক অবদান, Political Contribution of Nawab Sir Salimullah :
রাজনীতিতে সলিমুল্লাহর আবির্ভাব ঘটে বঙ্গভঙ্গের সময় (১৯০৫)। তিনি প্রথমে সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের শিক্ষার প্রসার ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন, যা মুসলমানদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে।
১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রথম অধিবেশনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং প্রস্তাব গ্রহণে সহায়তা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ও অন্যান্য সংগঠনের সভাপতি ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
তিনি বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিও সামনে আসে।
মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? Who founded the Mohammedan Provincial Union?
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় মুসলিম নেতারা একত্রিত হয়ে মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন গঠন করেন। এই সংগঠন পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করত। এটি পরবর্তীকালে মুসলিম লীগের ভিত্তি স্থাপনে সহায়ক হয়েছিল।
ঢাকার প্রথম নবাব কে ছিলেন? Who was the first Nawab of Dhaka?
ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক ভূষিত ঢাকার প্রথম নবাব ছিলেন খাজা আলীমুল্লাহ। অন্যদিকে, ঢাকার শেষ নবাব ছিলেন নবাব বাহাদুর খাজা হাসান আসকারি (১৯২০–১৯৮৪)। তিনি জমিদারি বিলুপ্তির পর এই পরিবারের প্রথম প্রধান উত্তরসূরি এবং শেষ নবাব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ সম্পর্কে জনশ্রুতি, Legends about Nawab Sir Salimullah :
বিশ শতকের শুরুতে পূর্ববঙ্গবাসীর স্বার্থ রক্ষায় নেতৃত্ব দেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, ঢাকার নবাবরা ধর্মভীরু হলেও আধুনিক ও সংস্কারমুক্ত ছিলেন। তাঁরা অসাম্প্রদায়িক ও হিন্দুদের প্রতি সদ্ভাবপূর্ণ হওয়ায় হিন্দু নেতারাও তাঁদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন।
নবাব সম্পর্কে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যনুসারে, নওয়াব সলিমুল্লাহর সময়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ১৮৯৩ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরি নেন। ১৯০১ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি নবাব এস্টেটের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় তিনি নৈশ বিদ্যালয় চালু করেন।
তিনি প্রথম পূর্ববাংলার উন্নতির জন্য স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠনের দাবি জানান। তাঁর প্রস্তাবেই ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ গঠিত হয় এবং ঢাকা রাজধানী হয়।
নওয়াব সলিমুল্লাহকে ঘিরে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। যেমন বলা হয়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬০০ একর জমি দান করেছিলেন। আসলে তাঁর পরিবারের এমন জমি ছিল না। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রমনায় সরকারের আগেই অধিগ্রহণ করা ২৪৩ একর জমি নির্ধারণ করা হয়। এ সংক্রান্ত রেকর্ড ঢাকা কালেক্টরেটে আছে।
এছাড়া নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৮৮ সালে বর্তমান বঙ্গভবন ও দিলকুশার একটি বিশাল এলাকা লিজ নিয়ে উন্নয়ন করেছিলেন, যার একাংশ পরে পল্টন ময়দান নামে পরিচিত হয়। তাই অনেক মানুষ এসব জমিকে নবাব পরিবারের সম্পত্তি ভেবে নিত।
প্রসঙ্গত, ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ তাঁর ‘নওয়াব সলিমুল্লাহ’ বইয়ে নবাব পরিবারের দান ও অনুদানের সংক্ষিপ্ত তালিকাও তুলে ধরেছেন।
নবাব সলিমুল্লাহ কবে মৃত্যুবরণ করেন? When did Nawab Salimullah die?
বঙ্গভঙ্গ রদের পর হতাশ ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নবাব সলিমুল্লাহ। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গীতে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা সহকারে তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
সামাজিক ও শিক্ষামূলক অবদান, Social and educational contributions :
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও নবাব সলিমুল্লাহ সামাজিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
- তিনি ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান বুয়েট) প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ দান করেন।
- সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
- বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ও ছাত্রাবাস নির্মাণে সহায়তা করেন।
- ঢাকার হস্তশিল্প ও শিল্পোন্নয়নে প্রদর্শনী আয়োজন করেন।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি দুটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন, যা আজও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে।
সম্মাননা ও স্মৃতি, Honors and memories :
ব্রিটিশ সরকার তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে একাধিক উপাধি প্রদান করে। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থানের নামকরণ করা হয়েছে—
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল
- স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ
- সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা
- নবাব সলিমুল্লাহ রোড
- বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশই তাঁর সম্মানে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।
উপসংহার, Conclusion :
নবাব বাহাদুর স্যার খাজা সলিমুল্লাহ ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টি, ত্যাগ ও অবদানের ফলে মুসলমানরা সংগঠিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়। সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগী ও সত্যিকার অর্থে জননেতা হিসেবে নবাব সলিমুল্লাহ আজও ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
Frequently asked questions
ঢাকার এক নবাব, তথা মুসলিম জাতীয়তাবাদী, এবং নিখিল ভারতীয় মুসলিম লীগের স্থপতি।
সলিমুল্লাহ ১৮৭১ সালের ৭ই জুন আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা নবাব আহসানুল্লাহর এবং মাতা বেগম ওয়াহিদুন্নেসার ।
১৯১৫ সালে।
১৯৯৩ সালে।


