🏆 আজকের ফ্রি বাংলা কুইজ খেলুন এবং Gift Voucher পুরস্কারের জেতার সুযোগ নিন।
Play Now
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উনবিংশ শতককে বলা হয় নবজাগরণের যুগ। এই সময়েই আবির্ভাব ঘটে বাংলা সাহিত্যের ভগীরথ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর। তিনি শুধু ঔপন্যাসিক নন, ছিলেন একাধারে কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং সমাজচিন্তক। বাংলা ভাষাকে তিনি যে মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন, তা আজও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষা কেবল আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যের আসনে আসীন হয়েছিল।
বাংলার সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্রের পরিচয়, Introduction to Bankim Chandra, the literary emperor of Bengal :
উনিশ শতকে, যখন বাঙালি ভাষা এবং সাহিত্য অবহেলা এবং স্থবিরতার এক পর্যায়ে যাচ্ছিল, তখন একজন ত্রাণকর্তা উত্থিত হয়েছিল যারা কেবল পুনরুদ্ধার নয়, বরং বাঙালি সাহিত্যেরও নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছিলেন। এই ব্যক্তিটি ছিলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (1838–1894), খ্যাতিমান এই উপন্যাসিক, কবি, সাংবাদিক এবং দেশপ্রেমিক সাহিত্য সম্রাট বা “সাহিত্যের সম্রাট” নামে পরিচিত, তিনি বাংলা গদ্যকে রূপান্তরিত করেছিলেন এবং আধুনিক ভারতীয় কথাসাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা, তাঁর দেশপ্রেমিক উদ্দীপনা এবং সংস্কারবাদী ধারণার সাথে মিলিত হয়ে তাকে ভারতীয় সাহিত্য এবং জাতীয় চেতনার ইতিহাসে স্থায়ী স্থান অর্জন করেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্ম, Bankim Chandra Chatterjee was born :
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ২৬ জুন ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে (১৩ আষাঢ় ১২৪৫ বঙ্গাব্দ) উত্তর ২৪ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার দেশমুখো গ্রামে। পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ডেপুটি কালেক্টর, মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী। শৈশবকাল থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন অতি মেধাবী। প্রথমে কাঁঠালপাড়ায়, পরে মেদিনীপুরে এবং হুগলি কলেজে তিনি পড়াশোনা করেন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
কাঁঠালপাড়া থেকে ফিরে বঙ্কিমচন্দ্র হুগলি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৫৬ সালে তিনি আইন পড়ার জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৫৭ সালে তিনি প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাশ করেন। ১৮৫৮ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বি.এ. পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। আইন পড়া শেষ হওয়ার আগেই তিনি যশোরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টরের চাকরিতে যোগ দেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা, Written by Bankim Chandra Chatterjee :
বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক উপন্যাসকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের নতুন যুগের সূচনা হয়। এরপর একে একে তিনি রচনা করেন কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী, রাজসিংহ, দেবীচৌধুরানি, আনন্দমঠ, কৃষ্ণকান্তের উইল, বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর, রজনী, রাধারানী প্রভৃতি কালজয়ী উপন্যাস। এছাড়া তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ, কাব্য, ব্যঙ্গরচনা ও ধর্মতত্ত্বমূলক গ্রন্থ রচনা করেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর রস। তাঁর লেখায় জ্ঞান বা বৌদ্ধিক ভাবের সঙ্গে সাহিত্যরসের এক অসাধারণ মিলন ঘটেছে। এই রসের মিশ্রণ বাংলা সাহিত্যে খুবই বিরল।
সমসাময়িক জাতীয়তাবাদের তীব্র পরিবেশে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যকর্মে দেশপ্রেম ঢেলে দিলেও, তাঁর মূল শক্তি ছিল মনন থেকে আসা সেই রস, যা বাংলা সাহিত্যকে প্রথম আধুনিকতার পথে নিয়ে গিয়েছিল।
এক কথায় বলা যায়, তাঁর উপন্যাসে ছিল কাব্যের ছোঁয়া, প্রবন্ধে ছিল বিজ্ঞানের যুক্তি, সঙ্গে ছিল গান, কবিতা আর দেশচেতনা; সব মিলিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য সাহিত্য সম্রাট।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস কয়টি? How many novels did Bankim Chandra Chatterjee write?
মোট ১৫টি উপন্যাস তিনি রচনা করেন। এর মধ্যে একটি ছিল ইংরেজি ভাষায়, বাকিগুলি বাংলা ভাষায়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ছিল দুর্গেশনন্দিনী এবং শেষ উপন্যাস ছিল সীতারাম।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস pdf / বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের নাম
- দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)
- কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬)
- মৃণালিনী (১৮৬৯)
- বিশবৃক্ষ (১৮৭৩)
- ইন্দিরা (১৮৭৩)
- যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪)
- রজনী (১৮৭৭)
- চন্দ্রশেখর (১৮৭৭)
- রাধারাণী (১৮৭৭)
- আনন্দমঠ (১৮৮২)
- দেবীচৌধুরানি (১৮৮৪)
- রাজসিংহ (১৮৮১)
- কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮)
- কমলাকান্তের দপ্তর (আংশিক উপন্যাসধর্মী)
- সীতারাম (১৮৮৭)
বর্তমানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রায় সব উপন্যাসই অনলাইন পিডিএফ আকারে পাওয়া যায়। বিভিন্ন ডিজিটাল লাইব্রেরি ও আর্কাইভ সাইটে যেমন—বাংলা সাহিত্য সংসদ, archive.org, প্রজেক্ট গুটেনবার্গ ইত্যাদিতে তাঁর উপন্যাসগুলি উন্মুক্তভাবে পাওয়া সম্ভব।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কাব্যগ্রন্থ, Bankim Chandra Chatterjee’s poetry collection :
যদিও তিনি মূলত উপন্যাসকার হিসেবে পরিচিত, তবুও তাঁর কাব্যগ্রন্থও বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো—
- ললিতা
- কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুবাদ
- বন্দে মাতরম (আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্গত হলেও কবিতার মর্যাদা পেয়েছে)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রবন্ধ গ্রন্থের নাম, Bankim Chandra Chatterjee essay book name :
তিনি ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থসমূহ হলো—
- লোক রহস্য
- বিজ্ঞান রহস্য
- কমলাকান্তের দপ্তর
- বিবিধ সমালোচনা
- সাম্য
- প্রবন্ধ পুস্তক
- কৃষ্ণচরিত্র
- ধর্মতত্ত্ব
- শ্রীমদ্ভগবদগীতা (ব্যাখ্যাসহ অনুবাদ)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস মনে রাখার কৌশল, Techniques for memorizing Bankim Chandra Chatterjee novels :
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলি মনে রাখার জন্য একটি সহজ কৌশল হলো—তাঁর উপন্যাসগুলোকে বিভাগ অনুযায়ী জেনে নেওয়া। কথা :
- ঐতিহাসিক উপন্যাস: দুর্গেশনন্দিনী, রাজসিংহ, মৃণালিনী।
- সামাজিক উপন্যাস: বিষবৃক্ষ, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল।
- ধর্মতত্ত্বমূলক উপন্যাস: আনন্দমঠ, সীতারাম।
- রোমান্টিক উপন্যাস: কপালকুণ্ডলা, ইন্দিরা, রাধারাণী।
- এইভাবে ভাগ করলে তাঁর রচনার নামগুলো সহজেই মনে রাখা যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছদ্মনাম, Bankim Chandra Chatterjee pseudonym :
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কিছু প্রবন্ধে ‘কমলাকান্ত’ নামে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ আসলে তাঁর ছদ্মনামের পরিচয় বহন করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মৃত্যু, Bankim Chandra Chatterjee dies :
১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান সাহিত্যিকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য হারায় তার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।
বঙ্কিমচন্দ্রয়ের সাহিত্য ও জীবন, Bankim Chandra’s Literature and Life :
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ছিল এক অদম্য সাহিত্য সাধনার ইতিহাস। সরকারি চাকরি সামলানো সত্ত্বেও তিনি সাহিত্যচর্চায় কখনো বিরতি দেননি। তাঁর রচনায় একদিকে যেমন ঐতিহাসিক কল্পনা, তেমনি অন্যদিকে সমাজ সংস্কারের বাস্তব বার্তা রয়েছে। তাঁর রচিত ‘আনন্দমঠ’ শুধু সাহিত্য নয়, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেও অমর স্থান অধিকার করেছে। তাঁর লেখা ‘বন্দে মাতরম’ গানটি ভারতের জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
উপসংহার, Conclusion :
সামগ্রিক বিচারে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন ঔপন্যাসিক নন, ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ। তিনি ছিলেন একজন অগ্রগামী, সংস্কারক, দার্শনিক এবং দেশপ্রেমিক। তিনি বাংলা সাহিত্যের গদ্যের ভিতকে মজবুত করেছিলেন, উপন্যাসের ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। বাংলা সাহিত্যকে তাঁর উপন্যাসগুলি উপহার দিয়ে, ভান্দে মাতারামকে অমর করে এবং সামাজিক ও জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্যে সাহিত্যের সংক্রামিত করে তিনি সত্যই “বাংলা সাহিত্যের ভগিরথ” উপাধিটির দাবিদার। তাঁর সাহিত্যই বাংলার নবজাগরণের প্রধান ভিত্তি। জীবনে এবং উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তাই তাঁকে যথার্থই সাহিত্য সম্রাট বলা হয়।
Frequently Asked Questions
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ২৬ শে জুন, ১৮৩৮ অর্থাৎ বাংলায় , ১৩ আষাঢ় ১২৪৫।
কমলাকান্ত।
দুর্গেশনন্দিনী।
‘বন্দে মাতরম’।
৮ই এপ্রিল , ১৮৯৪ সালে।

