🏆 আজকের ফ্রি বাংলা কুইজ খেলুন এবং Gift Voucher পুরস্কারের জেতার সুযোগ নিন।
Play Now
বাংলা কবিতার জগতে রাহুল পুরকায়স্থ ছিলেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শব্দকে গড়ে তুলেছেন নতুন আঙ্গিকে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন দক্ষ সাংবাদিক, যিনি খবরের ভাষাকে দিয়েছেন চিন্তার গভীরতা ও মানবিকতার স্পর্শ। কলোনি জীবনের টানাপোড়েন থেকে শুরু করে প্রেম, সমাজ ও রাজনীতি—সবকিছুই তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে অনন্য ভঙ্গিতে। সাহিত্য আর সাংবাদিকতা—দুই ধারাতেই তিনি ছিলেন সমান সিদ্ধহস্ত।
জন্ম ও শৈশব, Birth and childhood :
রাহুল পুরকায়স্থ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৪ সালের ৬ ডিসেম্বর, কলকাতায়। তাঁর শৈশব কেটেছে বেলঘরিয়ার উপকণ্ঠে। কৈশোরের সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সত্তরের দশকের উত্তাল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, যা পরবর্তীতে তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। পারিবারিক শিকড় ছিল শ্রীহট্টে, তবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়।
সাহিত্যজীবনের সূচনা, Beginning of literary career :
আশির দশকে রাহুল পুরকায়স্থ নিয়মিতভাবে কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্ধকার প্রিয় স্বরলিপি প্রকাশিত হয় আশির দশকের শেষের দিকে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে কুড়িটিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে—
- নেশা এক প্রিয় ফল
- আমার সামাজিক ভূমিকা
- ও তরঙ্গ লাফাও
- সামান্য এলিজি
তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে কলোনি জীবনের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, প্রেমের বহুমাত্রিক রূপ, সত্তর-আশির রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সমসাময়িক সমাজের টানাপোড়েন। তাঁর বহু কবিতা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
সাংবাদিকতা, Journalism:
কবিতার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও ছিল রাহুলের দ্বিতীয় প্রেম। রাহুল পুরকায়স্থের পেশাদারি সাংবাদিকতার শুরু হয়েছিল ‘আলোকপাত’ পত্রিকার মাধ্যমে। এরপর তিনি কাজ করেন দূরদর্শন দর্পণ-এ। পরে যুক্ত হন খাস খবর-এ। আর কর্মজীবনের শেষপর্বে ছিলেন TV9 বাংলা-য়। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একাধিক গণমাধ্যমে যুক্ত থেকে সাংবাদিকতার ভুবনে নিজস্ব ছাপ রেখে গিয়েছেন।
জি ২৪ ঘণ্টা-র জন্মলগ্নে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে টিভি নাইন বাংলার কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখনীতে খবরের ভাষা পেত এক নতুন মাত্রা—যেখানে তথ্যের পাশাপাশি থাকত ভাবনা ও বিশ্লেষণ।
সম্পাদনা ও আগ্রহ, Literary editing and interest :
রাহুল পুরকায়স্থ কবি ভূমেন্দ্র গুহর কবিতা সংগ্রহ সম্পাদনা করেছিলেন। সাহিত্য ছাড়াও দেশ-বিদেশের শিল্পকলা ও চিত্রকলার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
রাহুল পুরকায়স্থর কবিতায় বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব স্পষ্ট। কবি হিসেবে তিনি পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ মধুসূদন পুরস্কার। রাহুল পুরকায়স্থ লেখনীগুণে পেয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ কবিতা অ্যাকাদেমি দিয়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্মাননা। পেয়েছেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্মান এবং গৌতম বসু সম্মাননা।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ভারত-বাংলাদেশের ৭ জন সাহিত্যিকের মধ্যে তিনি ছিলেন ঐহিক সম্মাননা-প্রাপক। তাঁর বিশ্বাস ছিল—বাঙালিরা মহাকাব্যের সন্তান, আর পৃথিবীর সব মানুষ আজীবন আগুন হাতে প্রেমের গান গেয়ে চলে। তাই তিনি ছিলেন প্রান্তিক মানুষের কথাকার। এছাড়াও পেয়েছেন ভাষানগর সম্মান।
তাঁর লেখা কবিতার বইয়ের সংখ্যা ২০। পাঠক মহলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরেই উচ্চারিত হয় রাহুল পুরকায়স্থর নাম।
অসুস্থতা ও প্রয়াণ, Illness and death :
দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য রোগে ভুগছিলেন তিনি। জুলাই ২০২৫-এ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একসময় ভেন্টিলেশনে রাখা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। ২৫ জুলাই ২০২৫, দুপুর ২টা ১০ মিনিটে, কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।
উত্তরাধিকার, Legacy :
রাহুল পুরকায়স্থ ছিলেন শুধু কবি নন, সাংবাদিকতাতেও তিনি ছিলেন এক নির্ভরযোগ্য মুখ। বাংলা কবিতার ভুবনে তিনি রেখে গেছেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতা ও সাংবাদিকতার ভাষা আগামী প্রজন্মের কাছে প্রেরণা হয়ে থাকবে।
রাহুল পুরকায়স্থ কবিতা / রাহুল পুরকায়স্থ কবিতা pdf /রাহুল পুরকায়স্থ কবিতা বই / রাহুল পুরকায়স্থ শ্রেষ্ঠ কবিতা pdf
রাহুল পুরকায়স্থের শ্রেষ্ঠ কবিতা শীর্ষক একটি বই আছে, যেখানে লেখকের বিভিন্ন কবিতা সংকলিত রয়েছে। এখানে তাঁর কিছু কবিতা তুলে ধরা হল :
কল্পযান
১. পারাপারে যাবো আমি
যদি তুমি চাও,
এই দেহ স্রোতগামী,
পালে তোলো হাওয়া,
কামনাকঙ্কাল থেকে চাওয়া
প্রদাহে অন্তিম
বলো মন, প্রদক্ষিণে যাবো আমি,
আমার শরীর ভরা জল,
নিশিপথরেখা আজ কবিতাসম্বল
২. কাহিনিরা মৃতপ্রায় হরিণের চোখ
দৃষ্টিতে সবুজ পাতা ক্রমে ক্রমে শুষ্ক হয়ে আসে,
পতঙ্গেরা ঘোরে-ফেরে,
ফড়িংয়েরা উড়ে এসে দৃশ্যপথে বসে
তারাও কি মরে যাবে হরিণের সাথে
কাহিনির শেষে!
জলে লেখা কবিতা
তোমার শরীরাভাসে সারি সারি গ্রন্থ শুয়ে আছে,
জলে ভেজা কোনো বই,
কোনোটিতে রোদ-পোড়া দাগ,
স্মৃতিচিহ্ন নেই কোনোখানে!
নেই পাতা মুড়ে পড়া,
আবছা পেন্সিল-রেখা,
চায়ের গেলাশ!
শূন্যদৃষ্টি বাইন্ডারের সূচের আঘাত,
রাত-জাগা পুরনো আঠার গন্ধ,
ভূতের বরাত!
শোনো, গোপনে বইয়ের তাকে
কীটনাশকের পাশে
আমার সরলমতি সতর্কে রেখেছি,
সে বিবেচনার কথা বলে,
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে,
ইষৎ তোতলায়,
তাকে তুমি দিও নশ্বরতা, হিমস্রোত, প্রণয়তাম্বুল,
শহরতলিতে দিও গ্রামের শোলোক,
দিও বাঘনখ,
পুস্তক নিরীহ অতি, তাকে দিও অগোচর,
ভয়ের মুখোশ, দিও পুত্রশোক।
সাদা-কালো লেখা
পাশ ফিরি, স্পর্শে বিদ্যুৎ!
কে ছুঁয়েছে শরীর আমার দিবাস্বপ্ন! রঙের গোপন! পাশে তো কেউ নেই!
তোমার আমার মধ্যে ফাঁকটুকু ভরেছে বাতাস!
তবে কি আমাকে ছোঁয় শূন্যের সংগীত?
বিপদরেখার দিকে পাখি উড়ে গেলে তার ছায়াখানি ফেলে যায় আমার শরীরে!
শ্রুতি ও স্মৃতির মাঝে উঠে বসি, ধীরে
সামান্য এলিজি
(শেষ প্রচ্ছদের লেখা)
মৃত্যু অসুন্দর জানি
সুরা ও সুরের দেবীতে করি স্নান
প্রতি ভোরে
যমের দক্ষিণ দ্বার, গুহামুখে
উড়েছে পতাকা
আমাকে ও-ধ্বজা দাও
ধ্বজার শোণিতে মেলি ডানা
মৃতের সঙ্গম থেকে
জন্ম নিক সুরের বেদনা
কবিতা কল্পনালতা
স্বো মৃত্যু লেখে বাঁক বাঁকে
অবশেষ মৃত্যুজন্ম দিয়েছে আমাকে
হাঁটু মুড়ে বসে আছি তোমার শরীরে
এ-শরীর বিষভাণ্ড, ও-শরীর ছাই
নিজেকে জ্বালাই আর তোমাকে জ্বালাই
অতঃপর অন্ধকার, অন্ধকার শব
নিজেকে প্রশ্ন করে, অরব অরব
কাঁপে নদী, কাঁপে সাঁকো, ঘন বন
তাও কম্পমান
তুমি আমি নিদারুণ, আমি তুমি সমান সমান
মূর্ছা যাই, মূর্ছা যাও, শরীরে শরীর, ঢালি প্রাণ
কামনার প্রতি বাঁকে আমি আজও তোমারই সন্তান
কবি
বহিছে রঙের ধারা শরীরে শরীরে,
লাল নৌকা, জন্মান্ধ নৌকার মাঝি
নৌকাটি এগোয়, আর মাঝির সংসারে
অহরহ ঘটে যায় বর্ণবিপর্যয়
প্রকৃতি নিষ্ঠুর, লেখে কবিতা নিশ্চয়
মৃত্যুর দিকে
গিয়েছি ভুলের থেকে আরও আরও ভুলের ভিতরে,
দেখেছি ভুলের পোকা নেচে নেচে গান গায়
ফসলের ক্ষেতে,
আমি তো ভাগের চাষী,
শব্দের ফসলে তারা গুনি,
ঘর ভাসে, পথ ভাসে অনিশ্চিত স্বরহীনতায়
এইরূপে ক্রমে ক্রমে কবিতা মৃত্যুর দিকে যায়
রাহুল পুরকায়স্থের বই, Books by Rahul Purkayastha :
ছোটবেলা থেকেই শহরতলির সংগ্রামী জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন রাহুল পুরকায়স্থ। নকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময়ে কলোনির লড়াই-সংগ্রামের মধ্যে বড় হয়ে ওঠেন, আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে হাতে তুলে দেয় ক্ষুরধার কলম। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর ‘কলোনির কবিতা’।
শব্দের আলোয় তিনি তুলে ধরেছেন অন্ধকারের ছবি। তাঁর লেখা ‘বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা’ সত্তরের দশকের জীবন্ত দলিল। ময়দান ও পানশালার আলো-আঁধারি থেকে তিনি চিনিয়েছেন গোর্কির ‘নীচের তলা’-কে। প্রিয় স্বরলিপি গ্রন্থে তিনি ভালোবাসার মানুষদের বেঁধেছেন শব্দের সুরে।
- তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল ‘শ্বাসাঘাত তাঁতকল পুরনো হরফ’।
- প্রথম বইঃ অন্ধকার, প্রিয় স্বরলিপি (১৯৮৮)।
- অন্যান্য কাব্যগ্রন্থঃ শ্বাসাঘাত তাঁতকল পুরনো হরফ (১৯৯২), একটি জটিল আয়ুরেখা (১৯৯৫), গোরস্থান রোড (১৯৯৬), আমার সামাজিক ভূমিকা (২০০০), নিদ্রিত দর্পণে যা দেখি (২০১৭), নিরীহ ভ্রমের দেশ।
উপসংহার, Conclusion :
রাহুল পুরকায়স্থের প্রয়াণ বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তাঁর কবিতার পংক্তি, তাঁর লেখা, তাঁর নির্ভীক সাংবাদিকতার ভাষা চিরকাল বেঁচে থাকবে আগামী প্রজন্মের মধ্যে। তিনি ছিলেন শব্দের নিঃশব্দ সাধক—যাঁর সৃষ্টি ও সংগ্রাম পাঠকের হৃদয়ে অনন্তকাল প্রতিধ্বনিত হবে।

