ইতু পূজার বৃত্তান্ত, Summary of Itu Puja in Bengali

ইতু পূজা

🏆 আজকের ফ্রি বাংলা কুইজ খেলুন এবং Gift Voucher পুরস্কারের জেতার সুযোগ নিন।

Play Now Opens in a new tab.

বাংলার গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত লোকাচারের মধ্যে ইতু পূজা একটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় ব্রত। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আজকাল এইসব ব্রত পালনের রীতি কিছুটা হারিয়ে গেলেও, গ্রামবাংলার মা-ঠাকুমারা এখনও এই পূজাকে ধরে রেখেছেন বিশ্বাস আর আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে। ইতু পূজা সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবার পালিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো শস্য বৃদ্ধি, সংসারের কল্যাণ এবং পরলোকে মুক্তিলাভ।


“ইতু” শব্দের অর্থ কী? What does the word “itu” mean?

‘ইতু’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। কেউ বলেন এটি ‘মিত্র’ বা ‘মিতু’ থেকে এসেছে। মিত্র শব্দের অর্থ সূর্য। আবার কেউ মনে করেন ‘আদিত্য’ শব্দ থেকেই ‘ইতু’ শব্দের সৃষ্টি। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী অগ্রহায়ণ মাসে সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে থাকেন, তখন সূর্যের নাম মিত্র বলা হয়। সেই থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে ইতু পূজার প্রচলন হয়। অর্থাৎ ইতু পূজা আসলে সূর্য পূজা।

তবে অন্য মতে, ইতু পূজা আসলে ইন্দ্র পূজার এক রূপ। ঋগ্বেদের ‘ইন্দ্রস্তূপ’ শব্দ থেকেই নাকি ‘ইতু’ শব্দ এসেছে। বলা হয়, মেয়েরা ভালো স্বামী পাওয়ার আশায় ইন্দ্রদ্বাদশীর দিন ইতু পূজা করত। তবুও বাংলার নারীরা মূলত ইতুকে শস্যের দেবী হিসেবে মানেন এবং সেইভাবেই পূজা করেন।

ইতু পূজার নিয়ম, Rules of Itu Puja :

ইতু পূজা
Pin it

ইতু পূজো হলো গ্রামের পুরোনো এক ব্রত। আগে শীতকালের চাষের জন্য বীজ জোগাড় করাই ছিল এই পূজোর আসল আসল উদ্দেশ্য। একবার পূজো শুরু করলে প্রতি বছর তা করতে হয়, যতদিন না পরিবারের মেয়ে বা পুত্রবধূ সেই দায়িত্ব দায়িত্ব নেয়।

এই পূজোতে একটি ছোট মাটির ঘট সাজানো হয় লাল সাদা রঙে। ঘটের ভেতরে মাটি দিয়ে নানা শস্যের বীজ পোঁতা হয়। কয়েকদিন পর যখন গাছের অঙ্কুর গজায়, তখন সবাই মনে করে সংসারে সুখ আর সমৃদ্ধি আসবে। ঘটের গায়ে ছোট্ট পুতুল আঁকা হয়, আর খড়ের উপর রাখা হয় সরার মধ্যে ভরে মাটি। সরার চারপাশে রাখা হয় কলমীশাক, শুষনী, মানকচু, ধান এবং ছোলা, মুগ, মটর, তিল, যব ইত্যাদি ইত্যাদি বীজ।

পুজোর দিনে যে মেয়েরা ব্রত রাখে, তাদের সেদিন তেল হলুদ ছাড়া নিরামিষ খেতে হয়। সকালে পুজোর পর ফল আর প্রসাদ খাওয়া যায়। দুপুরে সিদ্ধ ভাত আর রাতে লুচি, রুটি বা মুড়ি খাওয়া হয়। তবে মুড়ি মাখিয়ে নয়, শুকনো খেতে হয়। এই সময়ে বাড়িতে পিঠেপুলি, পায়েস আর কোথাও নবান্নও হয়। নতুন চাল আর গুড় দিয়ে মিষ্টি পরমান্ন রান্না করে ইতুকে নিবেদন করা করা হয়। পুজোর সময় দুধ ময়দা আর ফলের নানাবিধ প্রসাদে নৈবেদ্য সাজানো হয় । একে বলা হয় ইতুর সাধ। পুজোর পরে সকল মহিলাদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয় সবার শেষে ব্রতকথা পাঠ করে পুজো সমাপন।

এক মাস ধরে ঘটের ভেতরে যে গাছগুলো জন্মায়, সেগুলো যত্নে রাখা হয়। মাস শেষে সংক্রান্তির দিন সেই ঘট নদী বা পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। সবার বিশ্বাস, ইতু পুজো করলে সংসারে সুখ শান্তি আসে আর ধন-ধান্যে ভরে ওঠে।

ইতু পূজা কেন করা হয়? Why is this worship performed?

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী—

  • সূর্যের আশীর্বাদে সংসারে ধন-ধান্য বৃদ্ধি হয়।
  • কুমারী মেয়েরা ভালো বর লাভ করে।
  • সধবা মহিলারা সন্তান লাভ করেন।
  • পরিবারের দারিদ্র্য, অশান্তি, অমঙ্গল দূর হয়।
  • নতুন ধান ও নবান্নের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় কৃষিজীবী সমাজে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ইতু পূজার মন্ত্র
Pin it

ইতু পুজোয় কি কি লাগে? / ইতু পূজার উপকরণ, Itu Puja Materials :

ইতু পূজার উপকরণগুলো হলো—

  • মাটির সর বা ঘট
  • গোবর মেশানো মাটি
  • ধান, কলমি, মানকচু, হলুদ, শুষনি শাক
  • আখ,
  • সরষে, মুগ, ছোলা, যব, তিল (আট প্রকার শস্য)
  • সোনা-রুপোর টোপর
  • ফুল, মালা, ধূপ, প্রদীপ, সিঁদুর
  • জামাই-নাড়ু, শিবের জটা, কাজললতা
  • ফল, মিষ্টি, দুধ, গুড়, চাল
  • নতুন ধানের নবান্ন

ইতু পূজার মন্ত্র pdf / ইতু পুজোর মন্ত্র কী? / ইতু পূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র, Mantra of Itu Puja :

ইতু পুজোর মন্ত্র-

 “ইঁয়তি ইঁয়তি নারায়ণ, তুমি ইঁয়তি ব্রাহ্মণ। তোমার শিরে ঢালি জল, অন্তিম কালে দিও ফল।”

ইতু পূজার সময় যখন ইতুর ঘটে দুধ ও গঙ্গাজল জল ঢালা হয়-

 “নামো ইতু লক্ষ্মী দেব্যায় নমঃনমো সূর্য দেব্যায় নমঃ” বলা হয়ে থাকে।

প্রনামের সময় মন্ত্র হিসেবে বলা হয় –

তুলসী তুলসী, মাধব লতা।
কও গো তুলসী কিষ্ণকথা।।
কৃষ্ণের কথা শুনলুম কানে।
শতেক পরণাম তুলসীর চরণে।।”

উপরিল্লিখিত মন্ত্রগুলি ছাড়াও ইতু পুজোর সময় যে মন্ত্রোচ্চারণ করতে হয় সেটি হল —

ইতু পূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র
Pin it

অষ্ট চাল অষ্ট দূর্বা কলস পাত্রে ধুয়ে
শুনো একমনে ইতুর কথা সবে প্রাণ ভরে
ইতু দেন বর
ধন-ধান্যে, পুত্র-পৌত্রে বাড়ুক তাদের ঘর
কাঠি-কুটি কুড়োতে গেলাম
ইতুর কথা শুনে এলাম
এ কথা শুনলে কী হয়
নির্ধনের ধন হয়
অপুত্রের পুত্র হয়
অশরণের শরণ হয়
অন্ধের চক্ষু হয়
আইবুড়োর বিয়ে হয়
অন্তিম কালে স্বর্গে যায়।।

পুজোর পর ব্রতের কথা শোনার সময় ৮টা আতপচাল ও ৮টা দূর্বা জলে ধুয়ে একটা ছোট পাত্রে রেখে হাতে রাখতে হয়।

ইতু পূজার ব্রত কথা / ইতু পূজার ব্রত কথা pdf download, The vow of this puja :

ইতু ব্রত কুমারী, সধবা কিংবা বিধবা সবাই পালন করতে পারে। এই ব্রতের পেছনে একটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত আছে।

কথিত আছে, একসময় এক গরিব ব্রাহ্মণ তার স্ত্রী আর দুই মেয়ে উমনো ও ঝুমনোকে নিয়ে সংসার চালাতেন। ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করে যা পেতেন, তাই দিয়েই চলত তাদের জীবন। একদিন তার খুব ইচ্ছে হলো পিঠে খাওয়ার। তাই কষ্ট করে চাল, গুড়, নারকেল, তেল জোগাড় করে স্ত্রীকে বলল পিঠে বানাতে, তবে শর্ত রাখল কাউকে যেন একটি পিঠেও না দেওয়া হয়।

ইতু পূজা ব্রত
Pin it

ব্রাহ্মণী পিঠে ভাজতে ভাজতে থাকলে ব্রাহ্মণ লুকিয়ে বসে প্রতিটি পিঠে গুনতে থাকে। পরে যখন খেতে বসে, দেখে দুটো পিঠে কম। রেগে গিয়ে সে জানতে পারে, দুটো পিঠে তার মেয়েরা খেয়ে ফেলেছে। এতে সে এতটাই রেগে যায় যে, মেয়েদের মাসির বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে ভোরে উমনো ও ঝুমনোকে নিয়ে জঙ্গলে যায়। সেখানে মেয়েদের ঘুম পাড়িয়ে রেখে একা ফিরে আসে।

রাতে জঙ্গলে বাঘ-ভালুকের গর্জনে মেয়েদের ঘুম ভেঙে যায়। ভয় পেয়ে তারা কাঁদতে থাকে আর ঈশ্বরকে ডাকে। শেষে একটি বটগাছের কাছে প্রার্থনা করে, যেন মা যেমন দশ মাস দশ দিন গর্ভে জায়গা দিয়েছেন, তেমনি গাছও এক রাতের জন্য তাদের আশ্রয় দেয়। গাছ সত্যিই ফাঁক হয়ে গিয়ে তাদের আশ্রয় দেয়।

সকালে তারা গাছকে প্রণাম করে রওনা হয়। কিছুদূর গিয়ে দেখে এক বাড়িতে মেয়েরা মাটির সরায় পূজা করছে। বাড়ির গৃহকর্ত্রী তাদের দুঃখের কথা শোনেন। মেয়েরা জানতে পারে, ওরা ইতু পূজা করছে। শর্ত হলো, আগের দিন উপোস থাকতে হবে। তখন উমনো ও ঝুমনো বলে যে তারা আগের দিন থেকে কিছু খায়নি। তাই গিন্নিমা তাদের পূজার ব্যবস্থা করে দেন।

সেইভাবেই তারা প্রথমবার ইতু পূজা করে। সূর্যদেব তাদের নিষ্পাপ ভক্তি দেখে আশীর্বাদ করেন এবং মনোবাসনা পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন। মেয়েরা বাবার দুঃখ দূর করার জন্য প্রার্থনা করে। সূর্যদেব তাদের আশীর্বাদে তাদের ঘরে ধান-শস্যে ভরে ওঠে। পরে তারা ঘরে ফিরে সব কথা জানায়। মায়েরও দুঃখ ঘুচে যায়, আর সেও ইতু পূজা শুরু করে।

এইভাবেই উমনো-ঝুমনোর কাহিনি থেকে ইতু পূজোর মাহাত্ম্য সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।

ইতু পূজার ব্রত কথা
Pin it

ইতু পূজার ছড়া, This is the rhyme of worship :

করিলে ইতুর পূজা বন্ধ্যা নাম যায়।
সময়েতে বিভা হয় তাহার মায়ায়।।
করিলে ইতুর পূজা দুঃখ হয় দূর।
ধনে পুত্রে পৌত্রে বাড়ে সুখের সংসার
।।”

সুজনি কলমি লহ লহ করে।
রাজার বেটা পক্ষী মারে।।
মারতক পক্ষ শুকোক বিল।
সোনার কৌটো রূপোর খিল।।
ছোটো মরায়ে পা দিয়ে বড়ো মরায়ে হাত দিয়ে
কিব রছ রাই ধানে বসে।
আমার জল তুলসী লাও নেমে এসে।
।”
—-

চাল ক’টা দিয়ে রাঁধল সখী
ভাত কটা দিয়ে খাই,
কড়ির চুপড়ি মাথায় করে
গয়লাবাড়ি যাই।
গয়লাভাই গয়লাভাই
ঘরে আছো ভাই?
আমার ইতু সাধ খাবে
ভালো দুধ চাই”।

পরিশিষ্ট, Conclusion :

ইতু পূজা বাংলার শস্য-সংস্কৃতি ও নারীকেন্দ্রিক লোকাচারের অন্যতম নিদর্শন। একদিকে সূর্যের পূজা, অন্যদিকে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা—এই দুইয়ের মিলনে ইতু পূজা একটি অনন্য রূপ লাভ করেছে। কৃষিনির্ভর সমাজে আজও এই পূজা শস্য, সন্তান, সমৃদ্ধি ও সংসারের মঙ্গলকামনায় পালিত হয়ে আসছে।

RIma Sinha

Rima Sinha is a professional journalist and writer with a strong academic background in media and communication. She holds a Bachelor of Arts from Tripura University and a Master’s degree in Journalism and Mass Communication from Chandigarh University. With experience in reporting, feature writing, and digital content creation, Rima focuses on delivering accurate and engaging news stories to Bengali readers. Her commitment to ethical journalism and storytelling makes her a trusted voice in the field.

Recent Posts